স্বাগতম গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়

নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব

নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব

মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রভাষক,

ইসলাম শিক্ষা

 

ইকরা (পড়)’। এই মহাবিশ্বের মহান স্রষ্ট। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরাইল আমীনের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোত্তম মানুষ হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে সর্ব প্রথম এই শব্দটি নাজিল করেছেন। ঠিক তখনই শুরু হয়ে যায় মহানবীর (সা.) মহান শিক্ষা আন্দোলন। বিশ্ব বিখ্যাত ঐতিহাসিক টমাস কার্লাইলের ভাষায় “মুহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাব জগতের অবস্থা ও চিন্তা স্রোতে এক অভিনর পরিবর্তন সংঘটিত করে। যেন একটি স্কুলিংগ তমাসাচ্ছন্ন বালুকা স্তুপে নিপতিত হল। কিন্তু এই বালুরাশি বিস্ফোরন বারুদে পরিনত হয়ে দিল্লি হতে গ্রানাডা পর্যন্ত আকাশ মন্ডল প্রদীপ্ত করল।”

রাসুল (সা.) এর মহান শিক্ষা আন্দোলন “ইকনরা” (পড়) শব্দ ধারণ করে যিনি নবী হলেন সেই মুহাম্মদ (সা.) নবুয়াত পাওয়ার পরই শিক্ষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন একজন উম্মি (অক্ষর জ্ঞান হীন) কিন্তু তিনিই হলেন আনের শ্রেষ্ঠ ধারক। মহানবী জানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন- জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলিম নর ও নারীর জন্য ফরয।” এর সময় সীমা সম্পর্কে বলেছেন- “তোমরা দোলনা হতে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জণ কর।” রাসুল (সা.) এর সাধনার চিত্রকে পূর্ণরুপ তুলে ধরে প্রখ্যাত প্রাচ্য ভাষাবিদ জামান পন্ডিত ইমানুয়েল ডিউস বলেন- “কুরআনের সাহায্যে আরবরা মহান আলেকজান্ডারের জগতের চাইতেও বৃহত্তর জগত, রোম সম্রাজ্যের চাইতেও বৃহত্তর সম্রাজ্য জয় করে নিয়েছিলেন। কুরআনের সাহায্যে একমাত্র তারাই রাজাধিপতি হয়ে এসে ছিলেন ইউরোপে, যেথায় ভিনিসিয়রা এসেছিল ব্যবসায়ী রুপে, ইহুদিরা এসেছিল পলাতক বা বন্দী রুপে।

শিক্ষা কি?

চীন দেশে একটি প্রবাদ আছে- তুমি যদি শত বছরের পরিকল্পনা কর, তাহলে গাছ লাগাও, আর যদি হাজার বছরের পরিকল্পনা

করে থাকো তাহলে মানুষ তৈরী করো। মহা কবি মিল্টনের মতে- “শিক্ষা হলো দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধন।” মহাকবি আল্লামা ইকবালের মতে- “মানুষের খুদী বা রুহকে উন্নত করার প্রচেষ্টার নাম শিক্ষা।” বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে- “মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর উন্নতি বা বিকাশ সাধনই শিক্ষা।” সক্রেটিস কিংবা প্লেটোর মতে- “নিজেকে জানার নামই শিক্ষা।” মিশরীয় অধ্যাপক মুহাম্মদ কুতুব এর মতে- “শিক্ষা হলো মানুষের বস্তুজীবন, পার্থিব জীবন ও আত্মিক জীবনের সমন্বয় স্থাপনকারী একটি মাধ্যম।”

কেন শিক্ষা অর্জন জরুরি?

আল্লাহ তায়ালা বলেন- “পড় তোমার রবের (প্রভু) নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” এক্ষেত্রে বলা যায় রব সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন জরুরী। রবকে জানা এবং তার আলোকে দুনিয়াকে জানা জরুরী। নবী (সা.) বলেছেন- “উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা দানের জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি।” অন্যত্র বলা হয়েছে- “আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” মহানবী (সা.) শিক্ষক হিসেবে মানুষের চরিত্রের পরিপূর্ণতা বিকাশের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। সুতরাং বলা যায় মানুষের সর্বোত্তম চরিত্রের বিকাশ সাধনের জন্য শিক্ষ্য প্রয়োজন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তিনি সেই সত্তা যিনি তাদের মধ্যে রাসুল প্রেরণ করেছেন যেন তাদেরকে আয়াত তেলাওয়াত করে শুনাবেন, পরিশুদ্ধ করবেন, তাদেরকে কিতাব শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে বিজ্ঞান কৌশল শিক্ষা দিবেন।” রাসুল পাঠানোর উদ্দ্যেশ হচ্ছে মানুষকে পরিশুদ্ধ করে কোরান ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে এখানে আসামান- জমিন, সমুদ্রসহ সকল জ্ঞান- বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। এই গুরুত্বের কারণেই মহানবী (সা.) যে শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার মাধ্যমে একদল সোনার মানুষ গঠণ করতে পেরে ছিলেন।

বৌদ্ধদের ইতিহাসেও দেখা যায় শিক্ষা ক্ষেত্রে ধর্মের উপস্থিতি। মালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা প্রদান করা হতো, তার মধ্যেও দেখা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে ছিল চরিত্র বা বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিকতা। হিন্দু ধর্মেও দেখা যায় বিদ্যা শিক্ষার মূলে ছিল বেদ। “বেদ” মানেই বিদ্যা। খ্রীষ্টানদের অতীতে গেলেও দেখা যায় তাদের শিক্ষাও ছিল গীর্জাকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা যা ধর্মের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ঠ নয় বা যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধর্মের বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলত একজন ছাত্রকে অঙ্ক, ইংরেজী, বিজ্ঞান পড়িয়ে একেকটি চালাক প্রাণীতে পরিণত করা গেলেও মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মানবিক মানুষ, আলোকিত মানুষ, বানানোর জন্য নানা অনুষ্ঠান আয়োজন ও শ্লোগান দেয়া সত্ত্বেও কোন সমাধান সম্ভব নয়।

ইসলামী শিক্ষা কি?

ইসলামী শিক্ষা বলতে শুধু মাত্র কোরআন, হাদিস, ও কিছু ফেকাহ বা মানতিক শিক্ষা দেওয়া বুঝায় না। যে শিক্ষা ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয় তাই ইসলামী শিক্ষা। ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমে নিম্নের বিষয় গুলো জানা সম্ভব-

১. আল্লাহর পরিচয় ও অধিকার

২. আল্লাহর সৃষ্টি জগত

৩. আল্লাহ ও তার সৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক

৪. মানুষের পরিচয়, জীবন, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে

৫. জীবন ও জগতের সমস্ত কর্তব্যের যোগ্যতা অর্জন

৬. সৃষ্টি জগত ও মানুষের কাজের ফলাফল

আল্লাহ তায়ালা বলেন- “অতঃপর আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) কে সকল জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন এবং তা সবই ফিরিশতাদের সামনে পেশ করলেন।” ফিরিশতাদের সামনে বনি আদমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার ছিল বস্তুনাম বা ব্যবহারিক শিক্ষা। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়নে উপরোক্ত দুটি প্রান্তিক দৃষ্টি ভঙ্গির সমন্বয় সাধন অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, লোক প্রশাসন, নৃ-বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, আইন প্রভৃতি বিষয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের সানতিক্তবাদী দৃষ্টি ভঙ্গীর পরিবর্তে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গীতে তা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা দরকার এবং পদার্থ বিজ্ঞান, প্রাণি বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ভুগোল, গণিত, পরিসংখ্যান প্রভৃতি প্রকৃতি বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে মহাবিজ্ঞানী ও সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা দরকার যাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে মুসলিম বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে কুরআন, হাদিস, ফিকাহ ও কালাম শাস্ত্রের আলোচনাতে ঐতিহ্যবাহী হালাল- হারাম, পাক- নাপাক বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিষয়ে বিশেষ করে সমাজ ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন প্রভৃতি বিষয়ক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

বৃটিশ পূর্ববর্তী প্রায় ছয়শত বছরের মুসলিম শাসনকালে এদেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল তা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা। এস,এম, জাফর ও অন্যান্য গবেষকদের অনুসন্ধানে তখনকার আরবি ও ফারসি মাধ্যমের স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের মাদ্রাসা গুলোতে ইসলামী জীবনাদর্শ ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত লোক তৈরির ব্যবস্থা ছিল। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ সিভিল সার্জেন্ট উইলিয়াম হান্টার সাক্ষ্য দিচ্ছেন- “আমরা এদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পূর্বে মুসলমানরা কেবল রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীই ছিলোনা, বরং জ্ঞান- বিজ্ঞানে এবং বুদ্ধি ও মেধাগত দিক থেকেও তারা ছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তাদের হাতে ছিল এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা যাকে কোন অবস্থাতেই খাটো করে দেখা যায় না। এতে ছিলো উন্নত নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের সু-ব্যবস্থা।

এই উপমহাদেশে শিক্ষার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং একে ধ্বংস করা হয়েছে তা প্রামাণিত সত্য। ১৮৩১ সালে উইলিয়াম হান্টার বলেনে- মুহাম্মদীদের একটি নব্য বংশধর আমাদের তৈরি করতে হবে যারা তাদের সংকীর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত নয় বা তাদের মধ্যযুগীয় আইন শাস্ত্রের তিক্ত তত্ত্বাবলী দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়, বরং তারা পাশ্চাত্যের বিচক্ষণতাপূর্ণ ও শাস্ত জ্ঞানরসে সিক্ত। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে বলেন- “বর্তমানে আমাদেরকে অবশ্যই যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে এমন একটি গোষ্টি সৃষ্টি করা যায় যারা আমাদের ও লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদের আমরা শাসন করছি তাদের মধ্যে দূতের কাজ করতে পারে। এরা এমন এক ধরনের মানুষ হবে যারা রক্তবর্ণে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তা- চেতনায় ও মন- মানসিকতায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে ইংরেজ।”

১৮৭১ সালে উইলিয়াম হান্টার তার ‘দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, গ্রন্থে বলেছিলেন- “এভাবেই শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী মুহাম্মদী যুবকদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাদের ধর্মে কোন রকম হস্তক্ষেপ না করেই এবং তাদের ধর্মীয় দায়িত্বশীলতা শিক্ষা দিতে দিতে আমাদেরকে ঐ ধর্মকে সম্ভবত কম আন্তরিকতাপূর্ণ করে হলেও অবশ্যই কম গোঁড়া করে ফেলতে হবে।”

যে সমস্ত মহান ব্যক্তি গণ জাতিকে উত্তম শিক্ষা ব্যবস্থা দান করেছেন তারা সকলেই সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন। মুসা (আ.) চল্লিশ দিন পর্যন্ত তুর পাহাড়ে, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) পনের চছর পর্যন্ত হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থেকে যে শিক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছিলেন তার দ্বারা আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলীর মত যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ গঠন করতে পেরেছিলেন। সেই মানুষ দিয়ে অর্ধ পৃথিবী কে শাসন করে ছিলেন। যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করেছিল। আজকের অশান্ত বিশ্ব যদি মহানবী (সা.) এর শিক্ষা ব্যবস্থার আলোকে একদল মানুয় তৈরি করতে পারে তাহলে বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

© গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় কর্তৃক সংরক্ষিত ২০২৪

কারিগরি সহায়তা: