স্বাগতম গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়

নারীর সেকাল ও একাল

নারীর সেকাল একাল

মো. আমিনুর রহমান
প্রাক্তন অধ্যক্ষ
গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়

 

মানব শ্রেষ্ঠ হযরত মহাম্মদ (স.) এর আবির্ভাবের পূর্বের যুগকে আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ বলা হয়। শুনেছি সে যুগে অত্যাচারের এমন দিক ছিল না যা অত্যাচারে অপূর্ণ নয়। চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, সম্পদ লুট-পাট, হত্যা এবং এক বংশের সঙ্গে অয়্যা বংশের বিবাদ শুরু হলে তা ছল কন্যা সন্তানকে জাবরে। গবাদী পশুর মত মানুষও কেনা বেচা হতও বালের যতে অত্যাচারের কথা জানতে পারি ভবিষ্যতে এ কন্যা সন্তানটি তাদের দেওয়া। কন্যা সহানকে জীবন্ধ করে দেবার কার একটি জন্য সন্তানটি জীবিত থাকলে ভবিষক্রয় করে দিতা স্থানটিন তাঁদের বংশের দুর্নাম কুড়িয়ে আনবে। অপেক্ষাকার কারণ ছিল কলাকেরা তাদের কন্যা সন্তানকে রিক্রমা আনত দিবানিশমে যোক্তিদের নিকট। যে সব নারীকে বিক্রয় করে মানুলোসী। পরিবারের কর্তা ব্যক্তিরা এই ক্রীতদাসীদিগকে ভোগের সামন্ত্রী মনে করত এবং নিজের সুখ থেগের জন্য হার স্ট্রীতদাসীদিগকে যা ইচ্ছা তা ব্যবহার করত। বর্তমানে যারা নিজেকে সভ্যতার জনক বলে দাবি করেন দের জন্য তার মানুষেরা শত বছর আগে স্বামী কর্তৃক বৃদ্ধ স্ত্রীকে ডাইনি বলে ঘোষণা করলে সমাজের লোকেরা সেই বৃদ্ধাকে সেই পাশ্চাত্যের মনুষ্যে ভারতবর্ষীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি নারীকে মৃত স্বামীর সাথে সহমরণে বাধ্য করেরে মতো প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও ভারতবর্ষীয় নারীদের অবস্থান।

মহাপুরুষ-মহামানবেরা যুগে যুগে পুরুষ শাসিত সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া নির্যাতন ও বঞ্চনার হাত থেকে নারী সমাজকে রক্ষা করার জন্য আজীবন প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। পুরুষ শাসিত সমাজ নারীকে চিহ্নিত করেছে পুরুষের ইচ্ছা অনিচ্ছাই নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা। বিশেষ করে ধর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণকারী মানুষেরা ধর্মকে আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, নারী অধিকারের বিরুদ্ধে ফতুয়া জারী করে। নারীরা শিক্ষার জন্য, চিকিৎসার জন্য অথবা অর্থ সঞ্চয়ের জন্য বাড়ার বাহির হওয়াকে শরীয়ত বিরোধী কাজ বলে ফতুয়া জারী করেছে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মহম্মদ (স.) জাহেলিয়াত যুগের নির্যাতন থেকে নারীজাতিকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নারী তথা মানুষ ক্রয় বিক্রয়কে এক জঘণ্য প্রথা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ক্রীতদাস-দাসী মুক্ত করাকে অশেষ নেকির কাজ বলে ঘোষণা করেছেন। আদর্শ কন্যা প্রতিপালন করেও দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা অবশ্যক বলে ঘোষণা করেছেন। যে নারী ছিল শুধু মাত্র ভোগের সামগ্রী সে নারীকে সম্পদের নায্য হকদার করেছেন। ঘোষণা করেছেন মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত। স্ত্রীর উপর স্বামীর যতটুকু অধিকার স্বামীর উপর স্ত্রীর ততটুকু অধিকারের কথা বলেছেন। পিতার অবর্তমানে মায়ের সেবার দায়িত্ব সন্তানের উপর অর্পণ করেছেন। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অন্ন-বস্ত্র-চিকিৎসা-বাসস্থান সব কিছুই সন্তান বহন করবে। কন্যা। বাবার সম্পদে অংশ পাবেন, স্বামীর সম্পদে অংশ পাবেন।। মহানবী (স.) নারীকে উপযুক্ত মর্যাদা দানের জন্য এতসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে গেছেন।

আমাদের মহানবী (স.) এর অবর্তমানে এখন কি হচ্ছে? ধর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে নারী সমাজকে শিক্ষা-দীক্ষা হতে বঞ্চিত রেখে ভোগের সামগ্রী বানানোর পায়তারা চলছে। সমাজের এ সব মধ্যমণি ধর্মকে পেশা হিসাবে গ্রহণকারী মানুষ নারীজাতিকে আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। জাহেলিয়া যুগের মানুষেরা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। আর এ যুগের মান সম্পন্ন মানুষেরা তাদের কন্যাদের ৬ষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করিয়ে বিয়ের মাধ্যমে পাত্রস্থ করে তাদের দায়িত্ব পালন শেষ করেন। এত অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে বাবা-মা তাদের দায়িত্ব শেষ করেন এ জন্য যে তারাও কন্যাদের ভয়ে আতঙ্কিত। না জানি কখন তাদের কন্যারা তাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয়, আর পাড়ার কোন বখাটে যুবক ঝামেলা পাকিয়ে বসেন জনি অল্প বয়সে কন্যাদের বিয়ে দেওয়াকে যদি আপনি সন্দেহ পোষন করেন থেকে আমার কথায় আপনার পাকিয়ে বসে। এত অল্প বয়সে কনপদের উত্তরবঙ্গের গ্রামের বালিকা বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে দেয়ায় পারেন। বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে দেবে আপনি অখ্যাত পর্বক উষ্ঠ শ্রেণীতে ছাত্রী সংখ্যা ১০০ হতে ১২৫ জন আর দশম শ্রেণীতে ছাত্রী সংখ্যা চেয়ে পরিদর্শনে গেলে আপনি দেখতে পাবেন। এই ঘোত্রা করে দশম শ্রেণী পৌছতে ৮০ জন মুখস্থ করে চলে গেছে। এই ছাত্রীরা ফোতে ৪০ জন। অর্থ এই দাঁড়ায় ৬ষ্ঠ শ্রেণী হলে যেত পারেন তা আমি জানি। তবুও আমি মুখথমে নারী আপনাদের কানের কারা কোথায় গেছে তা অবশ্যই আপনারা অনুমান করতে কবর দেয়ার চেয়ে বাদ্য দিবাহের মাধ্যে জাতিকে ভোগের সামগ্রী বাবার সম্ভব চিৎকার করে বলব কন্যাকে জীবন্ত মান অংশেই কম নয়। জানচক্ষু প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই এ সব অপরিপক্ক মেয়েদের বাল্য বিবাহের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে শ্বশুরবাড়ীর অন্ধকার কবরে।

বাল্য বিধাহের মাধ্যমে নারীজাতিকে পিছিয়ে দেওয়া, বিবাহের জন্য যৌতুক প্রথা, কথায় করার তালাক দেওয়া এবং হিতা বাল্য বিবাহের মাধানে প্রতিষ্ঠানে যাওয়া আসার পথে বখাটেদের অত্যাচার, পুত্র সন্তানের চেয়ে অন্যমা সন্তানের আদর যত্ন কম নেওয়া। ধর্মের নামে নারী সমাজের বিপক্ষে কাঠ-মোল্লাদের ফতুয়াজারী, প্রস্তাবে রাজী না হলে এসিড ছুড়ে ঝলসিয়ে দেওয়া, সব কিছুতেই পুরুষের উপর নির্ভরশীল করা পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার কাজ। এ যুগের এ সব নারী নিগ্রহ ও নির্যাতনের হাত থেকে নারীজাতিকে মুক্তির জন্য মহামানবেরা আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। সে রকম কিছু করার ক্ষমতা আমার মধ্যে। খুঁজে পাই না বলে নিজেকে নিজেই ধিক্কার দেওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। নারী জাতি মুক্তির জন্য আমি কিছু করতে না পারলেও উনিশ শতকের গোড়ায় জঘণ্য সতীদাহ প্রথা নিরোধ করতে গিয়ে ধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় হিন্দু রক্ষণশীল সমাজের কাছে নিগৃহীত হয়েছিলেন। হিন্দু বাল্য বিধবাদের অসহায় অবস্থার কবল থেকে পরিত্রান করতে গিয়ে লৌহমানর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিকূলতায় শতছিন্ন হয়েছিলেন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। ইসলাম ধর্মের রক্ষণশীলরা ফতুয়া জারি করেছিল মেয়েদের ঘরের বাহির হওয়া বড় গুণাহর কাজ এবং বাংলা ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করাও নাজায়েজ কাজ। মেয়েরা শুধু বাড়ির ভেতরে আরবি ও উর্দুভাষায় সামান্য জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। এ ফতুয়া জারির মাধ্যমে বাঙালী মুসলমান নারী সমাজ অবরোধ বাসিনী হল। অবরোধবাসিনী মুসলিম নারীদের অন্ধকার চিত্তপটে শিক্ষার জ্ঞানপ্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। রক্ষণশীল মুসলমানদের অত্যাচারে তিনিও প্রচণ্ড আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তবুও আমাদের সমাজ নারী নিগ্রহ-নির্যাতন ও বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে কি? কেন নারীরা এখনো অবরোধবাসিনী, কেন? অধিকাংশ মেয়েদের বাল্যবিবাহের স্বীকার হতে হয়? কেন নারীকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যা করা হয়? কেন নারীকে সম্পদের ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হয়? এসিড দিয়ে ঝলসিয়ে দেওয়া হয়? কেন নারী বখাটেদের অত্যাচারে আত্মহননের পথ বেছে নেয়? নারী সমাজের প্রতি এতসব অত্যাচার প্রমানণ করে জনগণকে তথা নারী সমাজকে রক্ষায় রাষ্ট্রীয় যন্ত্রটি কি আসলেই বিকল?

গ্রামের বালিকা বিদ্যালয়গুলোর আরো তাজা খবর আমার জানা আছে এবং তা প্রকাশ করা আমার নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। উদ্দেশ্য বালক বালিকাদের শরীরচর্চার মাধ্যমে দৈহিক গঠনের উন্নতি ও শরীর সুস্থ রাখা। এ জন্য প্রতিটি স্কুলে একটি খেলার মাঠও থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে বালকেরা স্কুল মাঠে খেলা-ধুলার সুযোগ পেয়ে থাকে কিন্তু বালিকা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করেন মেয়েদের খেলা-ধুলা করাটা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এজন্য গ্রামের বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েদের শরীর চর্চা শিক্ষক-শিক্ষিকাকে তাদের বিষয়ের ক্লাস বাদ দিয়ে ইতিহাস, ভূগোল ও অন্যান্য বিষয়ে ক্লাশ নিতে বাধ্য করা হয়। এ সবের প্রতিবাদ করে কে? থাক এসব কথা।

বলছিলাম যে, বর্তমান সমাজের বাবা-মাগণ তাদের কন্যাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত না করে বাল্যবিবাহ দিয়ে তাদের দায় দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। কিন্তু নারীজাতির মধ্যেই যে অসীম শক্তির সম্ভাবনা এবং বিস্ময়ের মেধা ও প্রতিভা প্রকাশ উন্মুখ হয়ে আছে তা আমরা জানি না। শিক্ষিত নারী যে বিকাশশীল পরিবার, সমাজ ও জাতির অগ্রগতির সকল প্রেরণা উৎস ও প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে তাও আমরা জানি না। নারীকে শুধু একজন নারী করে রাখলেই চলবে না, তাকে একজন আদর্শ গৃহিনী, আদর্শ মা, আদর্শ কর্মী সর্বোপরি একজন আদর্শ মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। মায়ের জাতির মুক্তির মধ্যে দিয়েই জাতির মুক্তির স্বপ্ন সফল হবে।

কাজেই পুরুষের পাশাপাশি আজ নারীকেও শিক্ষার আলোকিত প্রাঙ্গণে আহবান করতে হবে এবং তার সম্মুখে অবরুদ্ধ সকল দুয়ারকে খুলে দিতে হবে। জাগো নারী জাগো, জাগো বহ্নিশিখা। সে বহ্নিশিখায় পরিবার, সমাজ ও জাতির কল্যাণ প্রদীপগুলো একে একে জ্বলে উঠবে। থাক আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি? শুধু কবির ভাষায় বলব-

 

এ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর

‘ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’

 

© গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় কর্তৃক সংরক্ষিত ২০২৪

কারিগরি সহায়তা: